জনশূন্য আধুনিক শহর

চীনের এমন এক শহরের কথা -

  • ঐশী পূর্ণতা
  • ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৫:৫৫

 

নামেমাত্র কমিউনিস্ট শাসন থাকলেও চীনে এখন চলছে পুঁজির দাপট। সেই দাপটে এখানে-ওখানে গড়ে উঠছে শহর; তা সেই শহরে লোকজন না-ই বা থাকল। বিদেশী পত্রিকা অবলম্বনে চীনের এমন এক শহরের কথা লিখেছেন ঐশী পূর্ণতা


আধুনিক চীনকে তুলনা করা হয় একটি দ্রুত ধাবমান ট্রেনের সাথে, যে ট্রেনটি ঝড়ের গতিতে ওপরের দিকে ছুটে চলছে, কিন্তু এখনো শিখরের দেখা পাচ্ছে না। ট্রেনটির ব্রেক কষা যাবে না, গতিও কমানো যাবে না। যদি এক সেকেন্ডের জন্যও ট্রেনটি থামানো হয়, তাহলেই ঘটে যাবে মহাবিপর্যয়, যা নাড়া দেবে গোটা বিশ্বকে।
১০ বছর ধরে চলে আসছে এই অবস্থা। আর তাই চার দিক থেকে চীনে ছুটে আসছে বিনিয়োগকারীরা। বিনিয়োগ করছে মুনাফার আশায়। করবে না-ই বা কেন? চীনের বর্তমান অভিযাত্রাটি দেশটির শক্তিমত্তারই স্বীকৃতি। ভূগর্ভে তাদের কয়লার প্রমাণিত মজুদই ১৭০ বিলিয়ন টন। এর মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ থাকলেই সাধারণ একটি দেশের শত বছরের কয়লার চাহিদা মিটে যায়।


চীনে বিনিয়োগকারীদের একটা আকর্ষণীয় গন্তব্য এখন কাংবাশি; চেঙ্গিস খানের জন্মস্থান। আপনি যতই শহরটার কাছাকাছি হবেন, দেখতে পাবেন নতুন নতুন কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা কিনা চীন তৈরি করছে প্রতি সপ্তাহে দু’টি করে। দেখবেন চকচকে নতুন বৈদ্যুতিক খুঁটির জঙ্গল। দেখা মিলবে নতুন মোটরওয়ে ও এক্সপ্রেস রেলওয়ের জন্য পুঁতে রাখা অসংখ্য কংক্রিটের খুঁটিও। সঙ্কীর্ণ উপত্যকা, মাঝে মধ্যে দু-একটি ছোট গ্রামÑ এসব পেরিয়ে লাল মাটির খাড়া নির্জন পথটি উঠে গেছে ওপরের দিকে।
এই পথ চলতে চলতে আরো দেখা যাবে অবিশ্বাস্য রকমের লম্বা, নিচু, কালো ট্রেনে বোঝাই করা হচ্ছে কয়লা। সেই কয়লা নিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে ট্রেনগুলো চলে যাচ্ছে গন্তব্যের দিকে।


আমাদের ট্রেনটি যখন দং শেং এলাকার অরডস স্টেশনে এসে পৌঁছল, তখন আমার চীনা সঙ্গী কিন্তু বুঝতেই পারেননি যে, আমরা গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। অথচ এর আগে তিনি বহুবার এই স্টেশনে নেমেছেন। সর্বশেষবার তিনি যখন এখানে আসেন, তার সাথে স্টেশনের বর্তমান চেহারা নাকি মেলেই না! চার দিকে এত নতুন বাড়িঘর উঠে গেছে, চেনাই মুশকিল।


চীনা নেতাদের কেউ একজন ভেবেছিলেন, এই ইনার মঙ্গোলিয়াকে ইস্পাত ও কংক্রিটের ঝড় তুলে একুশ শতকে ঢুকিয়ে দেয়া হবে। আর এর জন্য এলাকাটিতে লাগবে বিপুলসংখ্যক মানুষ, চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া ও অবিরাম প্রবল ঝড়ো হাওয়ার কারণে যেখানে লোকবসতি কম। এই ভাবনা থেকে চীন সেখানে গড়ে তুলল বিরাট এক নতুন শহর। কিন্তু এই শহরে যদি লোকজন না আসে, না থাকে, তাহলে? অথচ কী নেই শহরটায়? দশ লাখ লোক স্বচ্ছন্দে বসবাসের উপযোগী কাংবাশি শহরে আছে অসংখ্য প্রশস্ত রাস্তা, বিপুল আয়তনের সেন্ট্রাল স্কোয়ার, অসংখ্য বাড়ি, কলকারখানা ও অফিস, শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে একটি নদী। আছে একটি ভাস্কর্য পার্ক, যেখানে অসংখ্য ভাস্কর্য দর্শকের অপেক্ষায়। বানানো হয়েছে ড্রাম আকৃতির একটি কনসার্ট হল, লাইব্রেরি আরো কত কিছু।


শহরের দিকে চলে যাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে থেকে তাকালে দেখা যায় অসংখ্য টাওয়ারের রাজকীয় সারি। তবে গাড়ির সংখ্যা একেবারেই কম। ট্রাফিক জ্যামের কথা তো চিন্তাই করা যায় না।


আশপাশের দু’টি ছোট গ্রামের লোকদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাদের ব্যবসায় এখানে নিয়ে আসতে। সরকার, সরকারি দল (কমিউনিস্ট পার্টি), সামরিক বাহিনী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটা চুক্তি হয়েছে। স্থানীয় সরকার এখানে রাস্তা, স্কুল ও অন্যান্য অবকাঠামো বানিয়ে দেবে। ব্যবসায়ীরা এখানে একটি গাড়ি কারখানা গড়বেন (কাজ চলছে), বানাবেন বিজনেস হেডকোয়ার্টার ও অন্য সব প্রয়োজনীয় কিছু। বড় বড় ভবন পাবে পুলিশ ও সেনাবাহিনী।


নগরটি গড়তে চীনের খরচ হচ্ছে ১০৭ কোটি পাউন্ড। তাদের পরিকল্পনা হচ্ছে, নগর গড়ে উঠলে মানুষ আসবেই। নয়া চীনের নব্য ধনপতিরা এখানে অ্যাপার্টমেন্ট কিনবেন। আস্তে আস্তে নগর ভরে যাবে মানুষে।


হতে পারে। তবে এখনো সে রকম কিছু হয়নি। এক ভরদুপুরে আমরা গেলাম চেঙ্গিস খান স্কোয়ারে। গাড়ির সংখ্যা এতই কম, একজন পথচারীর ৫০ গজ হেঁটে যেতে যত সময় লাগে, ততক্ষণেও একটা গাড়ির দেখা মিলবে না। চীনের অন্য কোনো শহরে এ রকম পরিস্থিতির কথা ভাবাই যায় না।


চেঙ্গিস খান ও তার বন্ধুরা ঘোড়ায় চড়ে আছেন, এ রকম দু’টি দৈত্যাকৃতির ভাস্কর্যের কাছেই একটি নোটিশ সাঁটানো : ‘ঘাসের পথ মাড়িয়ে চলবেন না’। কোথায় কিসের ঘাস, একটা-দুটো আছে কি নেই, চোখেই পড়ে না। আমি নির্দেশটি মানার প্রয়োজনই বোধ করলাম না। হাঁটতে শুরু করলাম তথাকথিত ঘাসের রাস্তা দিয়ে। আর যাই কই? সিকি মাইল দূর থেকে ছুটে এলো এক কর্মকর্তা। বোধ হয় ওই পথ কেউ মাড়ায় কি না দেখতেই তাকে ওখানে রাখা হয়েছে। এসেই লোকটি প্রচণ্ড রাগে চেঁচাতে লাগল। আমি নিশ্চিত, সে কয়েক ঘণ্টা ধরে বসে আছে, কিন্তু একজনকেও পাকড়াতে পারেনি। কিভাবে পারবে? শহরে মানুষই তো নেই।


কাছেই অনেকগুলো অসমাপ্ত অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক। নদীর তীর সাজানোর কাজ চলছে। সেখানে থাকছে আরো একটি পার্ক; চেঙ্গিস খানের মায়ের নামে। তার পঞ্চাশ ফুট উঁচু ভাস্কর্য সেখানে। ভদ্রমহিলা বেশ আকর্ষণীয় ছিলেন, এতে আর সন্দেহ কী!


শত শত ভবন, কোথাও মানুষের ছায়াটি পর্যন্ত নেই। কেবল নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে ক্রেনের ওপর এক-দু’জন নির্মাণকর্মীকে চোখে পড়ে।
এর মধ্যে চোখে পড়ল একটি ছোটো মুদি দোকান। ফলমূল ও গোশতের চড়া দাম শুনে চোখ কপালে উঠে যায়। আছে একটি হাইস্কুল। পড়াশোনার মান বেশ ভালো; প্রশংসা করার মতো। উচ্চ বেতন দিয়ে শিক্ষক আনা হয়েছে। ছাত্রদের থাকার সুব্যবস্থাও আছে।


একটি ছোট বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে। সেখানে আছে ব্যায়ামাগার, ডাইনিং হল এবং বেশ কিছু ভবন। এসব ভবনে সপ্তাহান্তে ১৫ মাইল দূরের লোকালয় থেকে শিশুদের এনে রাখা হয়। উদ্দেশ্য : শিশুদের কলকাকলি দিয়ে জনশূন্য শহরে প্রাণের সঞ্চার করা।


যারা এখানে অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন বা কিনতে আসছেন, তাদের অভিযোগ : এখানে জীবনযাত্রার ব্যয় খুব বেশি। আর জীবনই বা কী লোকজন নেই। দোকানে গোশত কিনতে এসেছিলেন স্থানীয় এক অধিবাসী। বললেন, গত ক’বছরে লোকসংখ্যা আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। জানতে চাওয়া হলো, তাহলে শহরের লোকসংখ্যা এখন কত? না, কেউ জানে না। কেউ কেউ ধারণা করেন, কত আর হবে, লাখ দেড়েক। তবে সন্ধ্যার পর অ্যাপার্টমেন্টের আলোহীন জানালা, শূন্য কারপার্ক দেখে মনে হয় না লাখ দেড়েক মানুষও এ শহরে বাস করে।


তবুও এ শহরের প্রথম সুপার মার্কেটটি চালু হয়েছে। রাজপথ ধরে চলছে বিশাল বাস। আছে সস্তা ও বেশি দামের রেস্তোরাঁ। শহরের প্রধান হোটেলটিতে মাঝে মধ্যেই বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। তবে সত্যিকার বিয়ে নয়, সাজানো। পুলিশ ও সেনাবাহিনী বড় বড় অফিস নিয়ে বসেছে। উদ্দেশ্য : সত্যি সত্যি না হলেও শহরটি ‘ব্যস্ত’ হয়ে উঠছে তা দেখানো।


কাংবাশি শহর সত্যিই কি কখনো ব্যস্ত হয়ে উঠবে? রাতের সব তারাই যেমন লুকিয়ে থাকে দিনের আলোর গভীরে, তেমনি এ প্রশ্নের জবাবও জানে কেবল আগামী দিন।