ঝড় আসছে

অনেক কিছু শেখার আছে বাংলাদেশে -

  • জুলফিকার হায়দার
  • ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৬:২৩


পৃথিবীর মানুষের জন্য অনেক কিছু শেখার আছে বাংলাদেশে। সমুদ্রের পানি যখন প্রতিনিয়ত বাড়ছে, তখন কিভাবে বাঁচতে হয় জনাকীর্ণ এই গ্রহে, তাই শেখা যাবে বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে। তাদের কাছে ভবিষ্যৎটা যেন ধরা দিয়েছে এখনই। বাংলাদেশের আইলাবিধ্বস্ত বিস্তীর্ণ উপকূলীয়
এলাকা ঘুরে লিখেছেন ডন বেল্ট। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক থেকে ভাষান্তর করেছেন  জুলফিকার হায়দার

সাত বিলিয়ন মানুষ এখন বাস করছে পৃথিবীতে। কিন্তু বাংলাদেশে আসলে হঠাৎ হঠাৎ মনে হবে লুজিয়ানার মতো একটা জায়গায় এই জনসংখ্যার অর্ধেকটা ঠেসে দেয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকা এতটাই জনাকীর্ণ যে এর প্রতিটি পার্ক আর ফুটপাথ দখল করেছে বাড়িঘরহারা মানুষ। ভোরের দিকে হাঁটতে বেরোলে ফুটপাথে চোখে পড়বে মশারি ঢাকা বিছানা আর ঘুমন্ত শিশুদের। বেলা বাড়তে থাকলে প্রায় দেড় কোটি মানুষের কথাবার্তা কুজনে ভর্তি হয়ে যাবে রাস্তাঘাট গলিপথগুলো। রাস্তাগুলোর বেশির ভাগই তখন গাড়িতে ঠাসা। হঠাৎ হামলে পড়া বন্যার পানির দু-এক ফোঁটার মতো এই মানুষের স্রোতে আরো চোখে পড়বে কিছু ভিক্ষুক, সবজিবিক্রেতা, পপকর্ন ফেরিঅলা আর সস্তা জুয়েলারি বিক্রেতাদের। অন্য দিকে গ্রামগুলো হলো বন্যার পলিতে গড়ে ওঠা চর। অনেক জায়গায় পার্কিং লটের মতো প্রাণবন্ত সবুজের চাদর। এ রকম জায়গাতেও নিঃসঙ্গতা আশা করলে হতাশ হতে হবে। সেখানেও মানুষের ভিড়। বাংলাদেশে কোনো জনমানবহীন সড়ক নেই।


বিস্মিত হয়ে লাভ নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। ভৌগোলিকভাবে প্রকাণ্ড রাশিয়ার চেয়েও এখানকার জনসংখ্যা বেশি। গাণিতিকভাবেই এই জায়গাতে কেউ চাইলেও সত্যিকার একা থাকতে পারবে না। এই ভিড়ের মধ্যেই টিকে থাকার অভ্যাস গড়ে নিতে হবে।


২০৫০ সালের বাংলাদেশের কথা ভাবুন যখন জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ২২ কোটির কাছাকাছি। জমির একটা অংশ স্থায়ীভাবে চলে যাবে পানির নিচে। এ অনুমান করা হচ্ছে দুটো বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে : একটা হচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, যেটা কিছুটা কমলেও সামনের দশকগুলোতে জনসংখ্যা বাড়বে প্রচুর। আর দ্বিতীয়টি হলো পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে জমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। এর মানে হলো, দক্ষিণ উপকূলে উদ্বাস্তু হয়ে যাবে ১০ থেকে ৩০ মিলিয়ন মানুষ। তাতে ঘনবসতি আরো বাড়বে অথবা জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে ছাড়তে হবে দেশ। একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দাবি, এই শতকের মাঝামাঝি গোটা পৃথিবীজুড়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়াবে ২৫ কোটির মতো। এদের বেশির ভাগই আসবে দরিদ্র ও সমুদ্র তীরের নিচু জমির দেশগুলো থেকে।


কথা হচ্ছিল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মুনিরুজ্জামানের সাথে। তিনি বলছিলেন, এটা হবে পৃথিবীর ইতিহাসে বৃহত্তম গণ-অভিবাসন। ২০৫০ সালের মধ্যে আমাদের সীমিত জমির শুধু যে ঘরবাড়িহারা মানুষই হামলে পড়বে, তা নয়। বরং সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভাগ বসাবে। ছোট হয়ে আসবে সীমানাও। ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির একটা বিশ্লেষণের কথা বললেন মুনিরুজ্জামান যেখানে বলা হয়েছে বাংলাদেশের এই গণ-অভিবাসনের প্রভাব পড়বে পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই। লাখ লাখ উদ্বাস্তু পাড়ি জমাবে ভারতে। দেখা দেবে রোগব্যাধি, বাড়বে জাতিগত ধর্মীয় দ্বন্দ্ব, কমে আসবে খাবার আর বিশুদ্ধ খাবার পানি। পাশাপাশি তীব্র হবে পারমাণবিক অস্ত্রধর ভারত আর পাকিস্তানের অস্থির শত্রুতা।


এরকম দুর্যোগের ব্যপারটা এখন পর্যন্ত অনুমান হলেও বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে খাপ খেয়ে যায়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে যুদ্ধ, মহামারী, রোগব্যাধি, বিধ্বংসী সাইক্লোন, বন্যা, সামরিক অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, দারিদ্র্য আর বঞ্চিতের উচ্চহার এসব লেগেই আছে। এসব দুর্যোগের কথা বাদ দিলেও বহু মানুষ এখনো লেখাপড়া জানে না। সবাই এখানে আসলে অন্য একটা বিষয়ের অপেক্ষায় রয়েছে যেন অতীতের সব কষ্টার্জিত সময়ের বিনিময়ে একটা শক্তিশালী আশা হয়তো জাগছে ভবিষ্যতের।


এত সব সমস্যার কারণেই মনে হয় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানো কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব। সম্ভাব্য সব ধরণের অল্প প্রযুক্তির ব্যবস্থা এখানে কাজেও লাগানো হয়েছে। এসব উদ্ভাবনে সহায়তা করছে শিল্পোন্নত দেশগুলো যাদের গ্রিন হাউজ নিঃসরণের কারণেই পরিবেশে এই বিপর্যয়। আর বাস্তবায়িত হচ্ছে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর হাতে। এই উদ্ভাবনগুলো গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে বেশ। বাংলাদেশে একটা জিনিসের অন্তত অভাব নেই মানুষের আস্থা। এই শতক পেরিয়ে যাওয়ার আগেই বাংলাদেশকে করুণা করার চেয়ে উল্টো হয়তো এ দেশের উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিতে চাইবে পুরো পৃথিবী।


পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই বাস করছে ৬২ মাইল দীর্ঘ সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায়। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস, সামনের দশকগুলোতে মিয়ামি ও নিউ ইয়র্কসহ সমুদ্রতীরের বড় বড় শহর ঘন ঘন উপকূলীয় বন্যার কবলে পড়বে। ১৩৬টি বন্দরনগরী নিয়ে চালানো এক গবেষণায় বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর শহরগুলোতে জনসংখ্যা অনেক বেশি। ২০৭০ সালের মধ্যে বিশ্বের যে দু’টি শহরে সবচেয়ে বেশি মানুষ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে, সে দু’টি শহরই বাংলাদেশে ঢাকা আর চট্টগ্রাম। এর ঠিক পরেই রয়েছে খুলনা। যদিও সমুদ্রের পানি বাড়ার পাশাপাশি পলি জমে গড়ে ওঠা চরের কারণে এ অঞ্চলের কিছু জায়গা টিকে যাবে, কিন্তু অন্য অধিকাংশ জায়গায় পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।


তবে সমুদ্রের পানি বেড়ে গেলে কেমন দাঁড়াবে ভবিষ্যতের চেহারা, সেটা দেখতে খুব একটা অপেক্ষা করতে হবে না বাংলাদেশকে। বঙ্গোপসাগরের তীরে বসবাসরত মানুষেরা এরই মধ্যে বুঝতে শুরু করেছে, জলবায়ু বিপর্যস্ত জনাকীর্ণ পরিবেশে বসবাস কেমন হতে পারে। সমুদ্রের উচ্চতা বাড়তে দেখছে তারা, উপকূলীয় লোকালয়ের ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হয়ে উঠেছে, ক্রমেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে বন্যা পরিস্থিতি আর তীব্রতর হচ্ছে উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রা। এসব পরিবর্তনই বৈশ্বিক পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে ঘটছে।


২০০৯ সালের ২৫শে মে, দক্ষিণপশ্চিম উপকূলের মুন্সীগঞ্জ গ্রামের ৩৫ হাজার মানুষ কিছুটা টের পেয়েছিল, কেমন হতে পারে সমুদ্র ফুঁসে ওঠার ফসল। সে দিন সকালে সমুদ্রে ওত পেতে ছিল আইলা নামের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়। হঠাৎই ৭০ মাইল বেগে তীব্র ঝড় ধেয়ে আসে উপকূলের দিকে। পুরো অপ্রস্তুত উপকূলের মানুষেরা তখন হয়তো জমিতে কাজ করছিল কিংবা মাছ ধরার জাল বুনছিল।


সকাল ১০টার কিছু পরে ৪০ বছর বয়সী জেলে নাসির উদ্দিন হঠাৎ খেয়াল করেন, নদীর পানি বাড়ছে কিন্তু স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে অনেক দ্রুত। মুহূর্তে তার চোখ চলে যায় সাগরের দিকে। বাদামি রঙের বিশাল ঢেউয়ের দেয়াল ততক্ষণে আছড়ে পড়ছে ছয় ফুট উঁচু মাটির বাঁধের গায়ে। এই বাঁধই গ্রামটাকে সমুদ্র থেকে বাঁচানোর সবশেষ পাঁচিল।


কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘরের মধ্যে পানির স্রোত। মাটির দেয়ালের সাথে সাথে ভেসে গেলো সব কিছুই। রান্নাঘরের টেবিল আঁকড়ে তার তিন মেয়ে তখন চিৎকার করছে। পায়ের পাতা ঘিরে জমে ওঠা ঠাণ্ডা লবণাক্ত জল ততক্ষণে হাঁটুতে উঠে এসেছে। ঘটনার মাস কয়েক পরে এসব বলছিল সে আমার কাছে। সেই মুহূর্তে নাসির উদ্দিন নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে তারা সবাই মারা যাচ্ছেন। কিন্তু তার মতে, অন্য পরিকল্পনা ছিল আল্লাহর।


অনেকটা দৈব ঘটনার মতোই একটা খালি মাছধরার নৌকা তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। মেয়েদের নিয়ে সেটা জাপটে ধরলেন নাসির উদ্দিন। মিনিট কয়েক পরেই তলিয়ে গেল নৌকাটি, কিন্তু ছুটতে দিলেন না নাসির উদ্দিনরা। ঢেউয়ের ধাক্কায় আবার যখন ওপরে উঠল নৌকা, তখনো জাপটে আছেন সবাই। শেষ পর্যন্ত পানি নেমে গেছে ঠিক, কিন্তু মারা গেছে শত শত মানুষ। ঘরবাড়িহারা হয়েছে হাজার হাজার। নাসির উদ্দিনের মতো তার আরো কিছু প্রতিবেশী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আবার ঘর বাঁধবেন তারা, এই মুন্সীগঞ্জেই। কিন্তু অন্য হাজার হাজার মানুষ নতুন জীবনের খোঁজে এলাকা ছেড়ে গেছে, পাড়ি জমিয়েছে খুলনা কিংবা ঢাকায়।


প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ হাজির হচ্ছে ঢাকায়। কেউ আসছে উত্তরাঞ্চলের বন্যা থেকে বাঁচতে, অন্যরা দক্ষিণের সাইক্লোন থেকে পালিয়ে। এদের অনেকেরই জায়গা হচ্ছে শেষমেশ কড়াইল বস্তিতে। এ ধরনের হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষে ঠাসা ঢাকা শহরে এখন আর নতুন মানুষের বসবাসের কোনো সুযোগ নেই। যারা আছে, তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতেই রীতিমতো হিমশিম খাওয়ার দশা।


কিন্তু বাংলাদেশের যেহেতু অনেক সমস্যা রয়েছে, তাই উন্নয়নশীল বিশ্বের গবেষণাগারের মতো দীর্ঘ সময় এ অবস্থার মাঝেই টিকে আছে দেশটি। সঙ্কটের পর সঙ্কট মোকাবেলা করে নিজেকে অনেক সমৃদ্ধশালী প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ, নিন্দুকেরা হয়তো যেটা কল্পনাই করতে পারবে না। ঢাকাতে গড়ে উঠেছে ব্র্যাক। উন্নয়নশীল বিশ্বের সবচেয়ে বড় অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি দেখিয়েছে কিভাবে শুধু মাঠকর্মীদের দিয়ে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যায়। বিশ্ব ক্ষুদ্রঋণের জন্মও দিয়েছে বাংলাদেশ নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস আর তার গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে।


আর অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, জন্মনিয়ন্ত্রণেও দারুণ সফল হয়েছে বাংলাদেশ। অতি মাত্রার জন্মহার কমাতে তৃণমূলপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম নেয়া হয় সত্তরের দশকে। ১৯৭৭ সালে যেখানে মহিলাপ্রতি প্রসবের হার ছিল ৬.৬, আজ সেটা কমে দাঁড়িয়েছে ২.৪-এ। এত দারিদ্র্য আর নিরক্ষরতার মধ্যে এটা একটা ঐতিহাসিক সাফল্য। জন্মহার কমানোটা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। সাধারণত সচ্ছল পরিবারে বাবা-মা তার সন্তানদের শিক্ষাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্যই জন্মহার নিয়ন্ত্রণ করেন। কিন্তু তেমন কোনো অর্থনৈতিক উন্নতি ছাড়াই এই হার নিয়ন্ত্রণে বিস্ময়কর সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ।


বেশ কিছু এনজিওর সহযোগিতায় মহিলাদের শিক্ষা আর কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টিতে ব্যাপক সফল হয়েছে বাংলাদেশ। ১৯৯৫ সালের তুলনায় বিভিন্ন কাজকর্মে মহিলাদের অংশগ্রহণ দ্বিগুণ হয়েছে। দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে রফতানিমুখী গার্মেন্ট খাতের সহায়তায়। পাশাপাশি জাতিসঙ্ঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ অর্জনে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ শিশু মৃত্যুহার কমানো। ১৯৯০ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে নাটকীয়ভাবে কমে গেছে শিশু মৃত্যুহার। আগে যেখানে প্রতি হাজারে মারা যেত ১০০ জন, সেটা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৩-এ। নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ।


ঢাকাতে মাত্রাতিরিক্ত দারিদ্র্য আর শহরমুখী মানুষের স্রোতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এই সাফল্য। তাই প্রতিকূল পরিবেশে কিভাবে টিকে থাকা যায়, সেই প্রকল্প নিয়ে এখন মাঠে নেমেছে ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্র্যাকের পরিবেশ বিপর্যয় ও দুর্যোগ মোকাবেলা বিভাগের প্রধান বাবর কবির জানালেন, তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো এসব বিপর্যস্ত মানুষদের তাদের গ্রামেই বেঁচে থাকার উপায় বাতলে দেয়া, যাতে তাদের রাজধানীমুখী স্রোত থামানো যায়। তারা জানে, আইলার মতো মারাত্মক ঘূর্ণিঝড়ে শেষ হয়ে যেতে পারে তাদের জীবন।


কতবার যে জায়গা বদলেছেন, সেটা ঠিকমতো মনেও করতে পারেন না ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ। ত্রিশ? চল্লিশ? তাতে কিছু কি যায়-আসে? আসলে তার ধারণাটাও বাস্তবের তুলনায় কম। কারণ তার হিসেবে জীবনের প্রতিটি বছরেই একবার জায়গা বদলাতে হয়েছে। আর এখন তার বয়স ৬০। এই চলমান জীবনের মধ্যেই ইব্রাহিম আর তার স্ত্রী জন্ম দিয়েছেন সাতটি সন্তান। এরা কেউই কখনো না খেয়ে থাকেনি বলে গর্বও করলেন তিনি। আচরণে বেশ একটা উষ্ণতা আছে তার। আর কথার মধ্যেও অন্য রকম একটা আনন্দের প্রকাশ।


খলিলুল্লাহ চরের বাসিন্দা। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার পলিতে গড়া সদা পরিবর্তনশীল এসব দ্বীপে বাস করা হাজার হাজার মানুষদেরই একজন সে। চরের অনেকগুলোর আয়তন এক বর্গকিলোমিটারেরও কম। জোয়ারভাটা, ভরা কাটাল, মরা কাটাল, বৃষ্টিপাত আর নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে মুহূর্তেই হারিয়ে যায় এসব চর। চর ডুবতে শুরু করলে নৌকায় চড়ে হয়তো পরিচিত অন্য কোনো চরের উদ্দেশে রওনা হয় বাসিন্দারা। কিন্তু দেখা যায় আরো আগেই পুরো তলিয়ে গেছে সেটি। পরে মুখে মুখে শোনা যাবে, মাইল কয়েক দূরে জেগে উঠেছে নতুন কোন চর। সে দিকেই নৌকা ঘোরাবে এরা। দিনের মধ্যে তৈরি হবে ঘর, রাতের মধ্যে তৈরি হবে বাগান। চরে জীবনধারণ, ফসল জন্মানো, ঘরবাড়ি তৈরি, পরিবারের ভরণপোষণ করা অভিযোজনের অলিম্পিকে স্বর্ণ জেতার মতো ব্যাপার। প্রতিকূলতার মোকাবেলায় এই চরের মানুষই সম্ভবত সমগ্র পৃথিবীতে অগ্রগামী।


চরে বাস করার কিছু কৌশল আছে, বললেন খলিলুল্লাহ। তার বাড়িগুলো এমনভাবে বানানো যেটা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খুলে, সরিয়ে অন্য জায়গায় আবার দাঁড় করিয়ে ফেলা যায়। সব সময় কমপক্ষে ছয় ফুট উঁচু মাটির পাটাতন বানিয়ে তার ওপর ঘর তৈরি করে সে। পারিবারিক স্যুটকেসটি সব সময় পরিপাটি সাজানো থাকে বিছানার পাশে যাতে দরকার পড়লেই হাতের নাগালে পাওয়া যায় সেটা। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিছু নথিও সংরক্ষণে আছে তার, যেগুলোর মাধ্যমে যেকোনো নতুন জেগে ওঠা চরে বসত গাড়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তার আসল রহস্যটা হলো কোনো বিষয়েই খুব বেশি দুশ্চিন্তা না করা। সব সময়ই চাপের মধ্যে থাকতে হয়, কিন্তু চিন্তা করে আসলে লাভ নেই বলছিল সে। ‘যত দিন সম্ভব এসব চরে বাস করি আমরা। তারপর নদীতে তা তলিয়ে যায়। যতই দুশ্চিন্তা করি না কেন, শেষটা সব সময় একই।’
কিন্তু বন্যা আর ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকা হওয়ায় বাংলাদেশীরা আসলে এখন থেকেই ভবিষ্যতের পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবেলার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। বহু বছর ধরেই লবণাক্ততা সহ্যক্ষম ধান উদ্ভাবনের চেষ্টা চলে আসছে। পাশাপাশি বাঁধ দিয়ে রক্ষা করা হচ্ছে উপকূলীয় নিচু আবাদি জমিগুলো। এতে বরং উৎপাদন আরো বেড়েছে। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের কারণে গড়ে তোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আগাম সতর্কবাণী দেয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বেশ কিছু এনজিও সম্প্রতি চালু করেছে ভাসমান স্কুল, হাসপাতাল আর লাইব্রেরি। তাকে বর্ষা মওসুমেও লেখাপড়া চালু থাকছে স্বাভাবিকভাবেই।


‘বাংলাদেশের ব্যাপারটা বলি’ বলছিলেন ৩৭ বছর বয়সী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জাকির কিবরিয়া। উত্তরণ এনজিওতে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছেন ভদ্রলোক। পরিবেশগত ভারসাম্য ও দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে কাজ করে এই এনজিওটি। ‘আমরা হয়তো দরিদ্র, আর দেখতে মনে হবে অগোছালো, কিন্তু আমরা কোনো পরিস্থিতির শিকারে পরিণত হই না। পরিস্থিতি যখন কঠিন হয়ে ওঠে, এখানকার মানুষ তা-ই করে যা সে যুগ যুগ ধরে করে এসেছে। তারা ওই পরিস্থিতির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়ে বেঁচে থাকে। পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবেলায় আমরা হলাম ওস্তাদ।’


সাইক্লোনের দুই বছর পর এখনো শুকাচ্ছে মুন্সীগঞ্জ। নাসির উদ্দিন আর তার প্রতিবেশীরা বাঁধ দিয়ে নিজেদের ঘর বাড়ি লবণাক্ত জলের কবল থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। নতুন করে ঘর বাঁধছে তারা। এর মধ্যে আবার বাঘের হাত থেকেও নিজেদের বাঁচাতে হয় তাদের। পাশের সুন্দরবন থেকে রাতে শিকারের আশায় এখানে হানা দেয় রয়েল বেঙ্গল টাইগার। জনসংখ্যা আর পরিবেশগত চাপ বাড়ার সাথে সাথে বাঘের আনাগোনাও বেড়েছে। বছর কয়েকের মধ্যে মুন্সীগঞ্জের বহু লোক বাঘের থাবায় মারা গেছে আর আহত হয়েছে। যে সপ্তাহে সেখানে ছিলাম, সে সপ্তাহেও মারা গেছে দু’জন। কতগুলো হামলা হয়েছে একেবারে প্রকাশ্য দিবালোকে।


এখানে জীবন বড় কঠিন, কিন্তু কীই বা আর করার আছে বলছিল নাসির উদ্দিন। চার ফুট উঁচু করে মাটির পাটাতন গড়েছে সে ঘর তৈরির জন্য। এনজিওর কাছ থেকে ঋণ পেয়েছে বিনা সুদে। এবার অবশ্য ঘর তৈরিতে কাঠ ব্যবহার করছে সে, যেগুলো পানিতে ভাসে। বাড়ির আশপাশের ধানক্ষেতগুলো এখনো পানিতে ভর্তি। অধিকাংশ পানিই লবণাক্ত। অনেক কৃষক এর মধ্যেই চিংড়ি আর কাঁকড়ার চাষ শুরু করেছে। গভীর নলকূপের পানিতেও এখন লবণ। বৃষ্টির পানি ধরে কিংবা এনজিওগুলোর পানির ট্রাক থেকে পানি সংগ্রহ করে প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে তাদের। মহিলারা মাথায় করে পানির কলসি নিয়ে চলেছে। এসব মহিলার ছবি তুলে নিয়ে যাও। তোমার দেশের মানুষকে দেখাও। বছর চল্লিশের মধ্যে এমন দৃশ্যই দাঁড়াবে দক্ষিণ ফ্লোরিডার বলছিল সামির রঞ্জন গায়েন। স্থানীয় একটি এনজিও চালায় সে।


মুন্সীগঞ্জের মানুষেরা সত্যটা খুব ভালোভাবেই বুঝেছে। সমুদ্রের সাথে যুক্তিতর্ক চলে না। আজ হোক, কাল হোক, তাদের গ্রাস করবে সমুদ্র। আর সে জন্যই হয়তো হাজার হাজার বাংলাদেশী বাক্স-পেঁটরা বেঁধে পাড়ি জমাচ্ছে অন্য গন্তব্যে। কপালে যাই থাকুক না কেন, পরোয়া নেই। চূড়ান্ত মুহূর্ত আসার আগ পর্যন্ত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে যাবে তারা। যখন একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়বে, তখনো চলবে শেষ মুহূর্তের চেষ্টা। জাতীয় মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলা যায় এটাকে। বেঁচে থাকার জন্য একটা বোধ আর যেকোনো পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা, যেটা হয়তো পৃথিবীর অন্য কারো সেভাবে নেই।


বিষয়টা উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলেন সাহিত্যিক আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ : ‘একদিন ঢাকার খুবই ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি। চার দিকে হাজার হাজার গাড়িÑ সবারই ভীষণ তাড়া। এর মধ্যে পাঁচ-ছয় বছর বয়সী এক বাচ্চার গায়ের ওপর প্রায় উঠিয়েই দিয়েছিলাম গাড়ি। বিপুল গাড়ির ভিড়ে রোড ডিভাইডারের ওপর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল সে। বিকট আওয়াজ করে মাথার শিশুটির ইঞ্চি কয়েক দূর দিয়ে চলে যাচ্ছিল গাড়ির ঝাঁক। কিন্তু পৃথিবীর অন্যতম অস্বাভাবিক এই গাড়ির ভিড়ের মধ্যেই গভীর প্রশান্তিতে ঘুমাচ্ছিল শিশুটি। এটাই বাংলাদেশ। অস্বাভাবিকতম পরিস্থিতির সাথেই মানিয়ে নিতে পারি আমরা। আমাদের চাহিদাও অতি সামান্য। আর এ কারণেই আমরা বলতে গেলে যেকোনো পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারি।