জেগে উঠছে বাগদাদ

যখন বাগদাদে ছিলাম -

  • হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী
  • ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৮:৪৮

সমৃদ্ধ নগরী বাগদাদ ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে শিকার হয়েছে নির্মম ধ্বংসযজ্ঞের। মধ্যযুগে বর্বর হালাকু খাঁ রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল এই নগরীতে। আর ‘আধুনিক’ যুগে তারই আধুনিক সংস্করণটি করেছেন ‘সভ্য’ জর্জ ডব্লিউ বুশ। কিন্তু তবুও থেমে যায়নি বাগদাদ; ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বারবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে প্রাচীন সভ্যতার নিশানবাহী নগরীটি। সেই কাহিনী লিখেছেন দখলদার বুশ বাহিনীর সাবেক সার্জেন্ট ব্রায়ান টার্নার।  বাংলা রূপান্তর করেছেন হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

সর্বশেষ যখন বাগদাদে ছিলাম, তখন আমি আমেরিকান সেনাবাহিনীর সেকেন্ড ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের একজন সার্জেন্ট। আমার পরনে মরুভূমিতে আত্মগোপন করার উপযোগী পোশাক, কাঁধে এম ফোর কারবাইন। এটা ২০০৩ ও ২০০৪ সালের কথা। তখন ইরাকে মোতায়েন রয়েছে দেড় লাখ আমেরিকান সৈন্য।
কত দিন আগের কথা! আমি প্রায়ই ভাবি, ইরাকিরা আবার তাদের চিরকালের জীবনধারায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ওয়েল্ডার তার কাজে ফিরছে; ট্যাক্সিচালক তার গাড়ি নামিয়েছে রাস্তায়, প্রবীণারা অবসর কাটাচ্ছে, তরুণ-তরুণীরা আবদ্ধ হচ্ছে বিয়ের বন্ধনে। আমি আরো ভাবি, বুকে লোহার বক্ষাবরণ আর আড়াআড়ি করে রাখা ২১০ রাউন্ড গুলি না নিয়েই বাগদাদের রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে কেমন লাগবে আমার!


স্মৃতিতে ভেসে ওঠে, আমার ইউনিটের সাঁজোয়া গাড়িগুলো বাগদাদ শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিদ্রোহীরা হামলা চালাচ্ছে, চলন্ত গাড়ি হঠাৎ বিস্ফোরিত হচ্ছে। পথ চলতে চলতে দেখতে পাই, বিধ্বস্ত গাড়িগুলোর ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নেয়া হয়েছে, কিন্তু রাস্তায় তার পোড়া দাগ এখনো লেগে আছে। মনে পড়ে, একদিন আমরা পজিশন নিয়েছিলাম আমাদের গাড়ির পেছনে। হঠাৎ আমাদের স্কোয়াড লিডার তীব্র স্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন আমি ও আমার মেশিন গানারকে লক্ষ্য করেÑ ‘সরে যাও, সরো ওখান থেকে!’ মুহূর্তমাত্র, তার পরই মর্টার বিস্ফোরিত হলো। বৃষ্টির মতো ঝরতে লাগল প্রাণঘাতী শার্পনেল। সেই ধাতববৃষ্টির মাঝখান দিয়েই আমরা গাড়ি নিয়ে ছুটতে লাগলাম। আমাদের দেহে যেন প্রাণ নেই, বুকের খাঁচায় হৃৎপিণ্ডটা ধুকপুক করছে মাত্র।


এত দিন পর এখন যখন আবার বাগদাদ নগরীর ওপর দিয়ে গাড়িতে যাচ্ছি, আমার মনের পর্দায় সেই স্মৃতিগুলো বারবার ভেসে উঠছে। কিন্তু সময় অনেক বদলে গেছে। যে বাগদাদকে আমি চিনতাম, এটা সেই বাগদাদ নয়। দজলা নদীর কাছে আবু নুওয়াস স্ট্রিটের কাছটায় একসময় চোরাগোপ্তা হামলা ছিল দৈনন্দিন ঘটনা। আর এখন? এখন সেখানে সবুজ ঘাসের মাঠে ফুটবল খেলছে একদল শিশু। যুদ্ধের দুন্দুভি নয়, ক্রীড়ারত শিশুদের উচ্ছল কলকাকলিতে মুখর হয়ে আছে এলাকাটা। তারা গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে, কথা বলছে। শুনলে মনে হয় যেন একদল পাখি আরেক দল পাখিকে ডাকছে।


২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত হাইফা স্ট্রিট গোত্রীয় সংঘর্ষে নরক গুলজার হয়ে থাকত। এখন দেখছি স্থানীয় মার্কেটের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে কথা বলছে একদল তরুণ। কথা বলতে বলতে তারা দাঁড়িয়ে পড়েছে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলছে। কথা শেষ হয় না তাদের। ওদিকে বুমবক্স থেকে ভেসে আসছে ইরাকি পপ মিউজিকের চড়া সুর। কাছেই একদল ইউনিভার্সিটি ছাত্রী, হাতে বইখাতা। ওরাও হাসছে আর কথা বলছে। তাদের কাছেই মেটে রঙের ভবন, কিন্তু ছাত্রীদের ওড়না ছড়াচ্ছে উজ্জ্বল রঙ। বৈপরীত্যের কী সুন্দর সহাবস্থান! বাগদাদ নগরীর সর্বত্র এই জেগে ওঠার শব্দ শোনা যায়।


অথচ আমি যখন বিমান থেকে নামি, লাগেজ বেল্ট থেকে আমার ব্যাগ খুঁজে নিই এবং শহরের দিকে পা বাড়াই, তখনো জানতাম না এত বছর পর বাগদাদ ফিরে কী দেখতে পাব। ২০১০ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকের কথা এটা। পত্রপত্রিকায় পড়েছি সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল দিয়ে গুপ্তহত্যার খবর। এটাই আমার চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। আমিও অপহরণের শিকার হতে পারি এই দুশ্চিন্তাটা কিছুতেই মাথা থেকে তাড়াতে পারছিলাম না। একবার মনে হলো, যাই, যে প্লেনে এসেছি, সে প্লেনেই ফিরে যাই। কিন্তু না, ভয়কে জয় করে আমি প্লেন থেকে নামলাম। একদিন যেখানে আমি যুদ্ধ করতে এসেছিলাম, সেই জায়গাটির এখন কী অবস্থা, জানতে চাই। মনকে বললাম, নতুন বাগদাদকে জানতে হলে কিছু পুরনো অভ্যাস ও স্মৃতিকে এক পাশে সরিয়ে রাখতেই হবে।

অ্যা সিটি অব ওয়ালশ
প্রথম দিন বাগদাদ নগরীতে বেরোনোর আগে আমি আমার টেবিলের ওপর বাগদাদের একটি মানচিত্র বিছিয়ে নিয়ে এর ওপর চোখ বুলাতে থাকলাম। মানচিত্রটিতে লাল-নীল ডট দিয়ে শহরের বিভিন্ন অংশ দেখানো হয়েছে। মানচিত্রটি খানিকটা পুরনো দিনের। মার্কিন বাহিনীর ইরাকে অনুপ্রবেশের পর বাগদাদের অনেক এলাকার নাম বদলে গেছে, যা এ মানচিত্রে নেই। যেমন পুরনো এই মানচিত্রটিতে এক জায়গায় দেখানো আছে ‘সাদ্দাম সিটি’। অথচ ওই জায়গার নাম এখন ‘সদর সিটি’, মরহুম শিয়া নেতা মুহাম্মদ আল সদরের নামে।


ডটের চিহ্ন ধরে ধরে আমি মানচিত্রে চোখ বুলাতে থাকি। এক দিকে লাল ডট, অন্য দিকে নীল। দজলা নদীর পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে শিয়ারা, পশ্চিমাঞ্চলে জড়ো হয়েছে সুন্নিরা। নদীতীর সংলগ্ন এলাকায় যাওয়ার জন্য শিয়ারা রাস্তা তৈরি করায় সুন্নিরা আরো একটু পশ্চিমে সরে গেছে। এক সময় ইরাকিরা গর্বভরে বলত, ‘বাগদাদ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মনিরপেক্ষ নগরী’, এখন আর সেই অবস্থা নেই, যদিও বাগদাদের অল্প কিছু এলাকায় বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের লোকজন এখনো পাশাপাশি বাস করে। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা সঙ্ঘাত এখানে তৈরি করেছে নতুন এক বাস্তবতা, যার ভিত্তি হচ্ছে গোত্র ও ধর্ম।


প্রায় ৬০ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাগদাদ এখন অনেকগুলো দেয়ালঘেরা ছিটমহলের নগরীতে রূপান্তরিত হয়েছে। এসব ছিটমহল নিয়ন্ত্রণকারীদের মধ্যে আছে ইরাকি সেনাবাহিনীর কোনো-না-কোনো দল, ফেডারেল পুলিশ অফিসারদের কেউ কেউ, স্থানীয় পুলিশ, বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী দল এবং অন্যান্য দল-উপদল (যেমন সন্স অব ইরাক)। ওরাই আপনার এলাকার পাহারাদার। ওদের একমাত্র অস্ত্র এ কে-৪৭ রাইফেল। এলাকাগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে কনক্রিটের বড় দেয়াল দিয়ে। স্থানীয় লোকজন এগুলোকে বলে ‘টি দেয়াল’। ইংরেজি ‘টি’ অক্ষরটি উল্টো করে বসালে যেমনটা দেখায়, দেয়ালগুলো অনেকটা সে রকম। শিয়া এলাকার প্রতিটি বাড়ির ছাদে ও মসজিদে তাদের ধর্মীয় পতাকা উড়তে দেখা যাবে। সুন্নি এলাকা চেনা যাবে পতাকার অনুপস্থিতি দেখলে। আমার দোভাষী ইউসিফ আল-তামিমি বলেন, ‘বাগদাদ এখন একটা বিশাল ক্যাম্প। আমেরিকা এখানে গণতন্ত্র আনেনি, দেয়াল এনেছে।’

দজলা নদীতে
দজলা নদীতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য এক সকালে আমি একটি ওয়াটার ট্যাক্সি ভাড়া করলাম। নৌযানটির চালকের নাম ইসমাইল। তিনি জানালেন, তারা বংশানুক্রমে এই পেশায় নিয়োজিত। তার পিতাও এ কাজ করতেন, তিনিও করছেন।


ইসমাইল যখন তার বাম হাত দিয়ে নৌকাটি চালাচ্ছিলেন আর কথা বলছিলেন, নদীর হাওয়া তখন আমার চুলের ওপর শীতল পরশ বুলিয়ে যাচ্ছিল। বিরাট নদীর ঢেউয়ে তখন আলোছায়ার খেলা। ভাবছিলাম, কত না ইতিহাসের সাক্ষী এই নদী! ১২৫৮ সালে হালাকু খানের নেতৃত্বে মোঙ্গলরা বাগদাদ দখল করে চালায় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। তারা শুধু বাগদাদবাসীকে খুন করেই ক্ষান্ত হয়নি, চালায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞও। লুটপাট চালায় বায়াত আল হিকমাহ (জ্ঞানগৃহ) নামের পাঠাগারে। এর সব বইপত্র ছুড়ে ফেলে এই নদীতেÑ দর্শন, কলা, কাব্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও অঙ্কশাস্ত্রের সংখ্যাহীন রচনা, যা কিনা বহু শতাব্দীর সঞ্চিত জ্ঞানভাণ্ডার, সবই নিক্ষিপ্ত হয় দজলার জলে। বলা হয়ে থাকে, বর্বর মোঙ্গলরা যখন এই জ্ঞানভাণ্ডার নদীতে নিক্ষেপ করে, তখন এর কালিতে নদীটির পানি পর্যন্ত কালো হয়ে যায়।


আর এ যুগে এ নদী ভরে গিয়েছিল লাশের পর লাশে। ২০০৪ সালের শীত ঋতুতে আমার ব্যাটালিয়ন একটি জলবোট ভাড়া নেয়। আমরা যাচ্ছিলাম মসুলের এক দ্বীপে তল্লাশি চালাতে। আমাদের নৌকাটি হঠাৎ ডুবে যায়। আমাদের সব সরঞ্জাম পানিতে তলিয়ে যায়। একজন আমেরিকান সৈন্য ও তিনজন ইরাকি পুলিশও নিখোঁজ। টহল বোট ও নৌবাহিনীর উদ্ধারকর্মীরা তাদের খোঁজে নদীতে ব্যাপক তল্লাশি শুরু করে। কিন্তু তাদের খোঁজ পাওয়ার আগেই অনুসন্ধানী দল উদ্ধার করে কিরকুক এলাকার এক ছাত্র এবং একজন ইরাকি পুলিশ সদস্যের লাশ। অথচ এ দু’জনের কাউকেই আমরা খুঁজছিলাম না।


ইসমাইলের ওয়াটার ট্যাক্সিতে বসে দজলার জলের দিকে হাত বাড়াতে আমার কেমন জানি সঙ্কোচ বোধ হচ্ছিল। দজলা তো এখন আর শুধু নদী নেই, এটা এক ধরনের গোরস্থানও বটে। গোরস্থানকে সম্মান করতে হয়।


নদীতে ঘুরতে ঘুরতে আমি ছবি তুলছিলাম। সেতুর পিলারের কাছে স্থাপিত চেকপোস্ট থেকে বিষয়টি লক্ষ করছিল ইরাকি সৈন্যরা। তারা আমাদের নৌকা ভেড়ানোর নির্দেশ দিলো। আমরা স্বল্পসময়ের জন্য বন্দী হলাম। চেকপোস্টের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন সৈন্যদের স্থানীয় কমান্ডার। তার পোশাক জীর্ণশীর্ণ, পায়ের বুটজোড়াও ছেঁড়াখোড়া। হাতে আরবি কফির ছোট্ট কাপ। তিনিই আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেন এবং শেষে ‘এই সেতুর আর কোনো ছবি নেবেন না’ বলে ছেড়ে দিলেন। আমরা চেকপোস্ট ছাড়ার আগে তারই এক সৈন্য তার প্লেট থেকে একটু ফেটানো ডিম খাওয়ার জন্য জোরাজুরি শুরু করে দিলেন। তিনি তার রুটিটি ছিঁড়ে দুই ভাগ করলেন এবং মৃদু হাসিমুখে এক ভাগ আমার হাতে তুলে দিলেন।


আমরা নৌকায় ফিরতেই নৌকাচালক ইসমাঈল গত সপ্তাহের একটি ঘটনা বললেন। সে সময় একটি চৌম্বক ‘স্টিকি’ বোমা পাওয়া যায়। এ ঘটনার সাথে একটি ওয়াটার ট্যাক্সিও জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এর পর থেকে ইরাকি সৈন্যরা নদীর ওপর সতর্ক নজর রেখে যাচ্ছে। আমার অবাক লাগল, এর মধ্যেও ইসমাঈল কিভাবে এখান থেকে রুজি রোজগার করে যাচ্ছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, সময় কখন ভালো ছিল। তিনি জবাব দিলেন : ‘ভালো সময়!!’

আল মুতানাব্বি স্ট্রিটে
আল মুতানাব্বি স্ট্রিটের শাহবন্দর ক্যাফের দরজার মুখেই একটা পাখির খাঁচা ঝোলানো। খাঁচায় একটা পাখি। আর ক্যাফের ভেতরে কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের ভিড়। তারা কথা বলছেন, তর্ক করছেন আর এসবের ভেতর দিয়ে নানা রকম বুদ্ধিবৃত্তিক জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজছেন। আমি গিয়ে বসলাম মোহাম্মদ জাওয়াদের পাশের আসনে। ৬৩ বছর বয়সী এই মানুষটি জীববিজ্ঞানের প্রফেসর। ক্যাফের দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো অনেকগুলো মানুষের ছবি। ২০০৭ সালে এক বোমা হামলায় ক্যাফের ভেতরে ও বাইরে এরা নিহত হন।


ক্যাফে থেকে বেরিয়ে আল মুতানাব্বি স্ট্রিট ধরে হাঁটছিলাম। স্ট্রিটের পাশে সাজানো টেবিল, টেবিলে বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে কবিতাসংগ্রহ ও পাঠ্যবই। দিনটি ছিল শনিবার, সময়টা দুপুর। রাস্তাটি ব্যস্ত, তবে জনাকীর্ণ নয়। আমি হাঁটছিলাম ধীরপায়ে; এটা-সেটা দেখতে দেখতে। হঠাৎ কে যেন ভেতর থেকে ধাক্কা দিয়ে আমাকে জাগিয়ে দিলো। আমি নিজের অজান্তেই মুহূর্তের জন্য সৈনিক জীবনে ফিরে গেলাম। চকিত চোখে তাকালাম চার দিকÑ কেউ আমাকে টার্গেট করেনি তো? আমাকে অনুসরণ করছে না তো?


হ্যাঁ, সত্যিই তাই। তবে কোনো ঘাতক নয়, তিনি একজন কবি। ক্যাফেতে প্রফেসর জাওয়াদের সাথে আমার আলাপের রেশ ধরে কবি বললেন, অবশ্যই আমি একজন কবি। কিন্তু বলুন তো, এ রকম একটি দেশে কবিতা লেখা ছাড়া আপনি আর কী করতে পারেন?


ফিরদাউস স্ট্রিটে গেলে এখনো যেন সাদ্দামের প্রেতাত্মার দেখা মেলে। এখানে ছিল তার একটি বিশাল মূর্তি। তার পতনের পর সেটি টেনে নামানো হয়। এখানকার লোকজনের সাথে কথা বললেই সাদ্দাম সম্পর্কে তারা বলে তারা সাদ্দামের ক্ষমতাচ্যুতি চেয়েছিল বটে, কিন্তু তার অসম্ভবকে সম্ভব করার যে দূরদৃষ্টি, তার অভাব তারা এখন অনুভব করে। উদাহরণ হিসেবে তারা বলে ১৯৯১ সালের একটি ঘটনার কথা। সে সময় উপসাগরীয় যুদ্ধ চলছিল। একদিন ইরানি বিমানের বোমাবর্ষণে দজলা নদীর একটি সেতু ধ্বংস হয়ে যায়। সাদ্দাম ওয়াদা করেন, সেতুটি এক মাসের মধ্যে সচল করা হবে। অসম্ভব একটা ডেডলাইন। কিন্তু স্থানীয় লোকজন জানায়, সত্যিই এক মাসের মধ্যেই সেতুটি ফের চালু হয়। অথচ শহরের কেন্দ্রস্থলে সাদ্দাম মসজিদের নির্মাণকাজ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অসমাপ্ত পড়ে আছে। কথা ছিল, এটা হবে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মসজিদ। এখন এর কনক্রিটের উঁচু উঁচু স্তম্ভগুলো বিশাল এক স্বপ্নের কঙ্কাল হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে।

প্রাইভেট ক্লাবে
এক রাতে আমি গেলাম আলাভিয়াহ ক্লাবে। ফিরদাউস স্কোয়ারের কাছেই এটি একটি প্রাইভেট ক্লাব। অনুজ্জ্বল নীলাভ আলোয় একটি ঝরনার পাশে বসে শিসা (হুঁকা) টানতে টানতে এদিক-ওদিক দেখছিলাম। আমার দুই টেবিল দূরেই এক সুবেশী ভদ্রলোক শিসা টানছেন। আলাপ হলো। জানলাম, তিনি ইরাকি সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল। এই সন্ধ্যারাতে বউয়ের কাছে গিয়ে কী হবে, তার চেয়ে একা বসে হুঁকোয় টান দিতেই ভালো লাগে তার।


ভালো লাগা-না-লাগার এই বিষয়টি অবশ্য জেনারেল নিজমুখে আমাকে বলেননি, বলেছেন ওই ক্লাবে আমাকে আমন্ত্রণকারী ব্যবসায়ী আল-নিয়ামি। এই মহিলার পরনে জিন্সের প্যান্ট, গায়ে ঝালর দেয়া ব্লাউজ, পায়ে কালো বুট। কানে ইয়ারিং। ছোট করে ছাঁটা চুলে নানা রঙের বাহার। তিনি একটি এনজিও চালান। তরুণ-তরুণীদের যোগব্যায়াম, নৃত্য, ছায়াছবি নির্মাণ, গ্রাফিক ডিজাইন ও সৃজনশীল লেখালেখি শেখানো হয় সেখানে। তিনি বলেন, ‘একজন ইরাকি নারী হিসেবে বলছি না, একজন মানুষ হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা শিক্ষার্থীদের বিকশিত হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সত্যি বলতে কি, এই তরুণরাই আমাদের জীবনের প্রাণপ্রবাহ।’ তিনি আরো বলেন, ‘এটাই সত্যিকার জিহাদ। জিহাদ মানে কিন্তু কাঁধে অস্ত্র নিয়ে ঘোরা আর মানুষ মারা নয়।’


নিয়ামির সর্বশেষ প্রজেক্ট হচ্ছে বাগদাদের জুভেনাইল ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে যাওয়া এবং কিশোরদের চিত্রকলায় উৎসাহিত করা। এখানে এমন অনেককে তিনি খুঁজে পেয়েছেন যাদের ক্ষমতা দেখে তিনি নিজেই বিস্মিত। ওদের বয়স পাঁচ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। অনেকেই এতিম; গোত্রীয় সঙ্ঘাতের সময় ওরা ওদের বাবা-মা হারিয়েছে। নিয়ামির ইচ্ছে আছে ওদের কাহিনী নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করার।

নতুন বাগদাদ
বাগদাদ ছেড়ে যাওয়ার আগে আমি আল কারাদাহ এলাকায় গেলাম। উদ্দেশ্য : দেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ইরাকি হুঁকা কেনা। তখন সন্ধ্যা নামছে, ব্যস্ত রাস্তা। দেখলাম জীবনের স্পন্দন আবার ফিরে এসেছে বাগদাদের রাস্তায়। দোকানপাট খোলা। দোকানের কাচের দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে। মাথাবিহীন ম্যানিকিনের গায়ে লেটেস্ট ফ্যাশনের পোশাক। খেলনার দোকান, হার্ডওয়্যার স্টোর, সেলফোনের দোকান, মুদি দোকান সর্বত্র প্রাণচাঞ্চল্য, তা সে ফুটপাথেই হোক কিংবা কোনো মার্কেটে। অথচ গতকালই বাগদাদে এক শিয়া সমাবেশে মর্টার হামলা হয়েছে। আল উতাফিয়াহ জেলায় এক মসজিদের কাছে একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। মসুলের রাস্তায় পাওয়া গেছে এক মহিলার লাশ। আগে যখন আমি লোকজনের সাথে কথা বলেছি, তাদের কণ্ঠস্বরে বছরের পর বছর হতাশার সুর বুঝতে কষ্ট হয়নি। আর এখন? এখনো এ শহরে টি-দেয়াল, সৈন্যদের টহল চলছে, তবুও তার মধ্যেই পুনর্জাগরণ ও প্রবৃদ্ধির চিহ্ন ফুটতে দেখতে পাচ্ছি।


নিজের ভেতরেও পরিবর্তনের ছোঁয়াটা অনুভব করছি। এই শহরে ফিরে আসার আগে যে উত্তেজনাটা অনুভব করছিলাম, তা থিতিয়ে এসেছে। আমি এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, একটি নতুন বাগদাদ জেগে উঠছে, যে বাগদাদ যুদ্ধতাড়িত নয়,্ যেখানে নেই যুদ্ধসাংবাদিক ও যুদ্ধবাজদের ব্যস্ততা। তার বদলে আছে অধিকতর প্রাণবন্ত ও সমৃদ্ধ একটি নগরী। জানি, যুদ্ধ আমাদের জীবনে এঁকে দিয়েছে এক অনপনেয় ক্ষতচিহ্ন। জানি, সময় লাগবে, তবুও এর মধ্যেই ধীরে ধীরে বাগদাদ তার রাজসিক চেহারায় ফের মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে; যেমনটি সে একদা ছিল।