আচমকা বিশ্বকে বেসামাল পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে করোনা ভাইরাস। চীনের ওহান থেকে খুব নিঃশব্দে এর সূত্রপাত হলেও এখন দাপট দেখাচ্ছে গোটা বিশ্বে। প্রথম দিকে চীনের কাছেও ততটা গুরুত্ব পায়নি এই মরণব্যাধি। আর বাকি বিশ্ব ছিলো একেবারেই উদাসিন। তখনো কেউ ভেবে উঠতে পারেনি, এই ভাইরাস-ই পাল্টে দিতে যাচ্ছে পৃথিবীর নিয়ম-কানুন।
অভিযোগ রয়েছে, শুরুতে এর প্রকোপ নিয়ে লুকোচুরি খেলছিলো চীন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চীনের এই লুকোচুরি খেলাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের জন্য। তবে বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন ভিন্ন কথা। তারা মনে করছেন, আদতে শুরুর দিকে ভাইরাসের মেজাজ ঠাহর করতে পারেনি চীন। অদ্ভুত এক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। প্রথমে সর্দি-কাশির মতো। পরে নিউমোনিয়া। প্রথমে ¯্রফে নিউমোনিয়া বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিলো। পরে প্রকোপ বাড়তে থাকে। আক্রান্তদের অনেকের মৃত্যুও হয়। এবার নড়েচড়ে বসে চীন। গবেষণায় নামে। ফলাফল আসে, এটা নিউমোনিয়া নয়। অদ্ভুত এক ভাইরাস, রহস্যের চাদরে ঢাকা। কীভাবে এর উৎপত্তি, সেটাও ঠিক করে বলা যায়নি। ধারণা করা হয়, উহানের কোনো এক লোক কোনো একটি বন্য প্রাণী খেয়েছিলো। সেটার শরীরে ছিলো এই ভাইরাস। কিন্তু কে ওই লোক?
এই প্রশ্নটা যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, ততদিনে ভাইরাসটি একের পর এক বাসা বাঁধতে থাকে মানুষের শরীরে। মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে হুমকি হয়ে দাঁড়ায় মানবজাতির জন্য। এই যখন পরিস্থিতি তখন ঝেড়ে কাশে চীন। গোটা বিশ্বকে জানান দেয় এই সঙ্কটের কথা। বিশ্ব তোলপাড় হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা শাস্ত্রের পাতা উল্টাতে থাকেন। কিন্তু কোথাও এই ভাইরাসের পরিচয় পাওয়া যায় না। এটা পৃথিবীর জন্য নতুন এক প্রাণঘাতি ভাইরাস। এর নাম দেওয়া হয় ‘নোভেল করোনা ভাইরাস’। যারা অর্থ ‘প্রাণঘাতি নতুন ভাইরাস’।
প্রথম আক্রান্ত চীন। যা পদক্ষেপ নেওয়ার নিতে হবে তাদের। রক্ষা করতে হবে নিজেদের। ছোয়াচে এই ভাইরাস এভাবে দাপট দেখাতে থাকলে গোটা চীন পরিণত হবে শ্বশানে! সুতরাং, যা করতে হবে দ্রুত সময়ের মধ্যে।
বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতেই ভাইরাসটির নাম রাখা হয় ‘কোভিড নাইনটিন’। একুশ তারিখ থেকে এর পেছনে লাগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। হিসাব-নিকাশ শেষে আবিষ্কার করে এর ভয়াবহতা। সতর্ক হয় চীন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একের পর এক সতর্কতা দিতে থাকে। সতর্ক হয় কিছু দেশ। তবে সেইসব সতর্কতাও ছিলো অনেকটা গা ছাড়া। তবে চীন ঠিক ঠিক বুঝে যায়, আসলে কি ঘটতে যাচ্ছে। সঙ্কট কাটাতে মাঠে নামে কোমর বেঁধে। চীন যখন কোমর বেঁধে নামে, তখন প্রতিটি পদক্ষেপ হিসাব করে ফেলে। তাদের হিসাব বলে দেয়, ভাইরাসের প্রকোপ ঠেকাতে উহানের হাসপাতালগুলো খুবই অপ্রতুল। এর জন্য চাই আলাদা হাসপাতাল। জরুরি সভা ডাকেন নীতিনির্ধারকরা। দিনটি ছিলো ২৩ জানুয়ারি। এই সভায় সিদ্ধান্ত হয় করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য আলাদা করে একটা হাজার শয্যার হাসপাতাল বানানো হবে। আর সেই হাসপাতালে রোগি ভর্তি শুরু হবে ২ ফেব্রুয়ারি থেকে। ২৩ জানুয়ারি হাসপাতাল বানানোর সিদ্ধান্ত, আর রোগি ভর্তির তারিখ ২ ফেব্রুয়ারি! হাতে মাত্র সময় দশদিন। কী করে সম্ভব?
মাত্র দশদিনে শুন্য থেকে এতো বড় হাসপাতাল বানানো যায় নাকি! হ্যাঁ যায়, এটা চীনের জন্য নতুন বিষয় নয়। সতেরো বছর আগে চীন যখন ‘সার্স’ ভাইরাসে আক্রান্ত তখন মাত্র ছয়দিনে ‘শাওটাংশা’ নামে একটা হাসপাতাল তৈরি করে দেশটি। আর এবার, তাদের হাতে সময় আছে দশদিন। আগের চাইতেও চারদিন বেশি।
অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মাঠে নামলো চীন। উহান শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে একটি খোলা মাঠ পাওয়া গেলো। মাঠের পাশে প্রশস্ত সড়ক। ওই সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হলো। ওখানে একের পর এক আনা হলো নির্মাণসামগ্রী। একদিকে সামগ্রী আসছে, অন্যদিকে পরিকল্পনা পোক্ত করা হচ্ছে। মাঠে কাজ করছে বিপুল কর্মী। একদল মাঠটিকে উপযুক্ত করছে। অন্যদল সড়ক দখল করে তৈরি করছে সরঞ্জাম। এই দু’টো দলকে নিয়ন্ত্রণ করছে ‘চায়না কনস্ট্রাকশন থার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুারো’। দ্রুত কাজ ঘরে তুলতে এরা অভিজ্ঞ। ২০০৩ সালে ‘শাওটাংশা হাসপাতাল’ বানিয়েছিলো এরা। এছাড়া পৃথিবীজুড়ে বড় বড় অনেক কাজ করার সুনাম আছে প্রতিষ্ঠানটির।
২৩ জানুয়ারি কাজ শুরু করার পর মাত্র দুইদিনে পাশের গাছ কেটে, মাটি সমান করে মাঠ প্রস্তুত হয়ে যায়। ২৬ তারিখ মাটির ওপর বালি ফেলার কাজ শুরু হয়। ৮ ইঞ্চি পুরো বালির ওপর ফেলা হয় একটি ফেব্রিকের স্তর। এর ওপর দেওয়া হয় পানিরোধী প্লাস্টিকের স্তর। এর পর আবার ফেব্রিকের স্তর। প্রস্তুত হয়ে যায় মেঝে। হাসপাতাল বানাতে মাটির ওপর কোনো খুঁটি দেওয়া হয়নি। সুতরাং মেঝের ওপরে যে কামরাগুলো বানানো হবে, সেগুলো অবশ্যই হালকা হতে হবে। সেইসব হালকা উপাদান তৈরি হচ্ছিলো মাঠের পাশের সড়কে। অ্যালুমিনিয়াম, কাঠ, ফাইবার গ্লাস এবং প্লাস্টিকের তৈরি উপাদানগুলো মাঠে এনে খাপে খাপ মিলিয়ে তৈরি করে ফেলা হয় পুরো হাসপাতালের কাঠামো। জানুয়ারির ২৭, ২৮, ২৯ এবং ৩০ তারিখ, এই তিন দিনের মধ্যে নির্মাণ কাজের বড় অংশ শেষ করা হয়। আইসোলেশন এবং কোয়ারেন্টাইনের উপযোগী কামরাগুলো তখন প্রস্তুত। জানুয়ারির ৩১ তারিখ থেকে ফেব্রুয়ারির ২ তারিখের মধ্যে হয়ে যায় ইন্টিরিয়র, স্যানিটরিসহ অন্য কাজগুলোও শেষ হয়ে যায়। হাসপাতাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ দেওয়া হয় সেনাবাহিনীকে।
কিন্তু রোগি ভর্তির কাজ শুরু হতে একদিন দেরি হয়ে যায়। আক্রান্ত রোগিদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া শুরু হয় ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখ থেকে।
চীনের এই দক্ষতা দেখে চমকে যায় বিশ্ব। অন্য দেশগুলোও নিজেদের মতো করে ভাবতে থাকে। ক্ষমতাধর কিছু দেশ তখনো আন্দাজ করতে পারেনি, তাদের দেশেও মহামারি হয়ে হামলে পড়বে প্রাণঘাতি ভাইরাস। সম্ভবত এ কারণেই হাতে সময় থাকার পরও এ ব্যাপারে বড় পরিকল্পনা নেয়নি তারা। তবে কিছু কিছু দেশ চীনের এই চমক থেকে অনুপ্রাণিত হয়।
ভাইরাসে আক্রান্ত দেশগুলোর তালিকায় প্রথম সারিতেই রয়েছে ফ্রান্স। আক্রান্তের সংখ্যা ৩৩৭২ হওয়ার পর ঘোষণা দেওয়া হয় একটি সামরিক হাসপাতাল তৈরি করার। দেশটির পূব দিকের মুলহাউস শহরে হাসপাতালটি বানানো হচ্ছে। এই শহরে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ওখানে সাধারণ হাসপাতালগুলোতে সঙ্কুলান হচ্ছে না। হাসপাতাল ছাড়াও বিশেষ কিছু ভবনে চিকিৎসা দিয়েও কুলিয়ে উঠা যাচ্ছে না। তাই সরকার নতুন হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দেয়।
চীনের পর পর সবচেয়ে বেশি প্রকোপ দেখা দিয়েছিলো ইরানে। দেশটির সঙ্গে তখনো আমেরিকার উত্তেজনা কাটেনি। এর মধ্যে নতুন এই মুসিবত চেপে বসায় সঙ্কট আরো প্রকট হয়ে উঠে। চীনকে অনুসরণ করে ইরান ঘোষণা দেয়, করোনা রোগিদের চিকিৎসার জন্য তিন দিনের মধ্যে তারাও একটি হাসপাতাল তৈরি করবে। মধ্যাঞ্চলের ইয়াযদ শহরে তিন দিনের মধ্যেই এই হাসপাতালটির নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়। পরে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম বসানো হয়। হাজার বর্গমিটারের এই হাসপাতালটি। ইয়াযদ পৌরসভার তত্ত্বাবধানে বানানো হয়। এতে জরুরি ওয়ার্ডের পাশাপাশি বায়োহাজার্ড পরিচালনার সরঞ্জাম রাখার জন্য একটি গুদামঘর রয়েছে।
চীনের বাইরে ইতালির পর এখন ভাইরাসটি ব্যাপকভাবে জেঁকে বসেছে স্পেনে। সামাল দিতে সরকারি হাসপাতালগুলোর নাকানি-চুবানি খাওয়ার মতো অবস্থা। পরিস্থিতি বিবেচনায় গত ১৬ মার্চ সবগুলো বেসরকারি হাসপাতালকে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ঘোষণা করতে হয়েছে দেশটিকে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ জানান, বেসরকারি হাসপাতালের সব সুবিধা সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। করোনা রোধ না করা পর্যন্ত সরকারই সব হাসপাতাল পরিচালনা করবে।
কেবল স্পেনের সরকার নয়, বেসরকারিভাবেও অনেকে এগিয়ে আসছেন করোনা মোকাবেলায়। হাসপাতালগুলো পরিচালনা করতে সহযোগিতার হাত বাড়াচ্ছেন ধনকুবেররা। এগিয়ে এসেছেন লিওনেল মেসিও। জাতিগতভাবে আজেন্টাইন হলেও বছরের বেশিরভাগ সময় তাকে স্পেনেই কাটাতে হয়। তিনি বার্সেলোনার একটি হাসপাতালে ১ মিলিয়ন ইউরো অনুদান দিয়েছেন।
বৈশ্বিক এই সঙ্কটে হাতখুলে অনুদান দিচ্ছেন অনেক ব্যাবসায়ী ও বিশ্বনেতারাও। সমস্যায় জর্জরিত এলাকাগুলোতে সহযোগিতার হাত বাড়াচ্ছে ধনী কিছু রাষ্ট্রও। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যায় দুইজন আক্রান্ত হওয়ার পর এগিয়ে আসে মধ্যপ্রাচ্যের আলোচিত দেশ কাতার। গাজার সুরক্ষার জন্য কাতার কাজ করবে বলেও ঘোষণা দেয়।
কেবল কাতার নয়, নির্যাতিতদের এই উপত্যার দিকে বরাবরই কোমল থাকে সচেতন বিশ্বের। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ঘন বসতির এই উপত্যকাকে করোনার সর্বনাশ থেকে রক্ষায় বিশ্বের নানা দিক থেকে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে সাহায্য। এসব কাজে লাগিয়ে গাজার খোলা মাঠে তৈরি হচ্ছে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। এর আগে উপত্যাকার দক্ষিণ এলাকায় মাত্র ২০ জনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখার সুবিধা ছিলো। তবে ওই এলাকাতেই স্কুল, হোটেলসহ রয়েছে ব্যাপক জনসমাগম। আর আছে বারো শ’ লোকের বসতি। পরিস্থিতি আরো সঙ্কটের দিকে গেলে এই উপত্যকার চিকিৎসাব্যবস্থা ধসে যেতে পারে। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে রাফাহ ক্রসিংয়ে এই ‘ফিল্ড হাসপাতাল’টি তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে শুরু হয়ে গেছে কাঠামো বানানোর কাজ। তুমুল ব্যস্ততা নিয়ে কাজ করছে শ্রমিকরা।
ফিল্ড হাসপাতালটিতে থাকছে ৩৮টি সাধারণ বিছানা। ছয়টি নিবিড় পরিচর্যার বিছানা। আর মাঝারি পরিচর্যার জন্য ৩০টি বিছানা। সন্দেহভাজনদের কোয়ানেন্টাইনের জন্য রাখা হয়েছে আরো ৫৯টি কামরা। যদি এতেও সঙ্কুলান না হয়, তবে উপত্যকার বাইরে নিয়ে আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার। সেই বিকল্প এলাকা হতে পারে গাজা ও ইসরাইলের মধ্যবর্তী এলাকায় নির্মিত একটি মাঠ হাসপাতাল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্বেগ, গাজার মতো ঘনবসতির বদ্ধ এই উপত্যকায় মহামারি প্রকট হলে বাসিন্দারা অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়বে। নেমে আসতে পারে ভয়াবহ পরিণতি। তাই আগে থেকেই শক্ত ব্যবস্থা। যা অনেক দেশের জন্যই নেওয়া হয়নি। এমনকি এখনো তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।